ঢাকার রাস্তায় এআই ক্যামেরা

 

ঢাকার রাস্তায় পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক কন্ট্রোলে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরা হেলমেট না পড়া, রঙ সাইডে যাওয়া, ট্রাফিক লাইট না মানা—এমন নানা ধরণের আইন ভঙ্গের বিষয়গুলো ট্র্যাক করছে। অনেকক্ষেত্রে অটো মামলা হয়ে যাচ্ছে। 
.
বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো একে সরকারের অসাধারণ একটা কৃতিত্ব হিসেবে দেখাচ্ছে। কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকেও এ ক্যামেরাগুলো কতটা সমস্যাজনক—সে আলাপটা বুয়েটের প্রফেসর ড. শামসুল হক, বিইউপির এসিস্টেন্ট প্রফেসর মালিহা তাবাসসুম থেকে নিয়ে অনেকেই করেছেন। সব লিংক নিচের সাইটে পেয়ে যাবেন।  
.
আমি একটি ভিন্ন পার্সপেক্টিভ থেকে আলোচনা করি। 
.
সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্র হোক, কিংবা টেক বিলিয়নিয়ার হোক, সবাই নাগরিক, কাস্টোমার—মোট কথা সাধারণ মানুষের যত বেশি সম্ভব তথ্য নিজের হাতে জমা করে। ব্যবসা, কাস্টোমার সার্ভিস, নাগরিক সুবিধা, নিরাপত্তাসহ নানা অজুহাতে এ তথ্যগুলো তারা হাতিয়ে নেয়। একসময় এ তথ্যগুলো তারা জনতার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে। 
.
রাষ্ট্রের কাছে মোটামুটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য থাকে—এনআইডি, বার্থ সার্টিফিকেট, আয়-রোজগারের পরিমাণ, পরিবারের তথ্য থেকে নিয়ে অনেক কিছু। আবার টেক কোম্পানির সাথে কোলাবরেট করে তারা আমাদের চ্যাটলগ, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, প্রেফারেন্স, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, কল রেকর্ড—সবকিছু যোগাড় করে নিতে পারে। 
.
এভাবে রাষ্ট্র আমাদেরকে আমাদের নিজেদের চেয়ে বেশি জানে। সে জানে আমাদের ভালো লাগা, খারাপ লাগা, আমাদের আনন্দ-ভীতির পয়েন্ট, আমাদের স্ত্রী-সন্তানের সাথে কেমন সম্পর্ক, কার দূর্বলতা কোথায়। এডওয়ার্ড স্নোডেন লিখেছিলেন, কীভাবে পরিবারের তথ্য ব্যবহার করে তারা এমন মানুষকে ফাঁসাতো, যাকে লিগ্যালি ফাঁসানো যাচ্ছে না। 
.
তাই সরকারের যেকোনো তথ্য একোয়ারের ব্যাপারে সন্দেহ করা উচিত। সেটা হেলথ কার্ড হোক, কিংবা এআই ক্যামেরা হোক। 
.
এআই ক্যামেরার মাধ্যমে কী কী করা যাবে?
.
১. নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ
২. চলাচলের গতিবিধি অনুসরণ
৩. চেহারা শনাক্তকরণ (ফেসিয়াল রিকগনিশন)
৪. আচরণের ধরন বিশ্লেষণ
৫. পুলিশের ডেটাবেসের সাথে সমন্বয়
.
এর মাধ্যমে মানুষের খুব গুরুত্বপূর্ণ ও পার্সোনাল তথ্য চলে যায় রাষ্ট্রের হাতে। চলাচলের ইতিহাস, যাতায়াতের অভ্যাস, অবস্থানের ধরন, আচরণগত তথ্য এগুলো খুব সহজেই ট্র্যাক করতে পারে, প্যাটার্ন ধরতে পারে। 
.
এ তথ্যগুলো দিয়ে কতকিছু করতে পারে রাষ্ট্র লক্ষ্য করুন। ধরুন, রাষ্ট্র অন্যায় অবিচার করা শুরু করলো, ফলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসলো। তখন সরকার এই এআই ক্যামেরা ব্যবহার করেই আন্দোলন দমনে কাজ করতে পারবে। সরকার সেক্ষেত্রে—

১. বিক্ষোভকারী ও নেতাদের চেহারা ডিটেক্ট করতে পারবে, জাতীয় ডেটাবেসের সাথে মেলাতে পারবে। ফলে তাদেরকে গ্রেফতার ও দমন সহজ হবে

২. বিক্ষোভ শুরুর আগেই এর ভয় দেখিয়ে আন্দোলনের প্রেরণা কমিয়ে দেওয়া যাবে 

৩.  জমায়েতের স্থানগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়ে বিক্ষোভের পুরো নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করা

৪. আন্দোলনে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করা 

৫. জুলাইয়ে যেভাবে হেলিকপটার, বোমা বর্ষণের কাজ করা হয়েছে, সেগুলোর এর সাহায্যে আরো ইফেক্টিভলি ও স্ট্র্যাটেজিকেলি করা যাবে 
.
একই ধরণের এআই ক্যামেরা ইন্সটল করা হয়েছি আমেরিকা, হাঙ্গেরি, চীন ও রাশিয়ার মত দেশগুলোতেও। প্রতিটা দেশেই এটা দমন পীড়নের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক—সব সরকারই নজরদারি করতে ও বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করতে ফেসিয়াল রিকগনিশন টুলের ব্যবহার বাড়িয়েছে।  
.
হংকং-এ তো ২০১৯ সালের বিক্ষোভের সময় আন্দোলনকারীরা ফেসিয়াল রিকগনিশন ফাঁকি দিতে মাস্ক পরা, ক্যামেরায় লেজার রশ্মি ফেলা এবং ছাতা ব্যবহারের মতো কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। 
.
দ্য ব্রুকিংস ইন্সটিটিউটের সিনিয়র ফেলো ড্যারেল এম ওয়েস্ট সুন্দর সামারি করেছেন, "প্রায় সব প্রযুক্তিই 'দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য' হাতিয়ার—যা মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে, আবার নিপীড়নের যন্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। 
.
প্রযুক্তি নিজে থেকে তার গঠনমূলক বা ধ্বংসাত্মক ব্যবহার নির্ধারণ করে না; এর প্রভাব নির্ভর করে মানুষ কীভাবে তা ব্যবহার করছে তার ওপর। যেসব দেশ  স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকেছে, তাদের অভিজ্ঞতা বলে—সেখানকার শাসকরাই শেষপর্যন্ত প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে।"
.
তাই সাময়িক সুবিধা দেখেই খুশী না হয়ে যাওয়াই কাম্য। যারা জনমানুষ ও কওমের উন্নয়নের চিন্তা করছেন, তাদের এ বিষয়গুলো আরো ক্রিটিকেলি দেখতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারকে সাময়িক সুবিধা দেখে ইজি পাস দিয়ে দেওয়া যাবে না। 

লিখেছেনঃ ইরফান সাদিক

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন