এসব নিয়ে লেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবসায়ীরা যা শুরু করছে মনে হচ্ছে তারা নারীদের জন্য মহান কিছু আবিষ্কার করে ফেলছে। যেটা ব্যবহার করতেই হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে এরা নারীদের ভুল বুঝিয়ে, মিথ্যাচার করে নারীর সতীত্ব নষ্ট করা আর পাপের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার মিশনে নেমেছে। পোস্টটি বুঝতে হলে ছবিটি ভালো করে দেখে নিন।
ইদানিং কিছু পেইজ মেন্সট্টুয়াল কাপ বিক্রি করতেছে। খুব ভালো, সাশ্রয়ী, নিরাপদ বলে প্রচার করছে। তাদের কমেন্ট আর রিভিউ মধ্যে অধিকাংশই ফেইক আইডিধারী। কী বুঝলেন?
নারীর পিরিয়ড হবে, পিরিয়ডের রক্ত বাইরে বেরিয়ে যাবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। নাপাক, ক্ষতিকর বিষাক্ত রক্ত মেন্সট্টুয়াল কাপ দিয়ে জরায়ু মুখের কাছাকাছি আটকে রাখার কোনো মানে হয় না।
আসুন দেখি মেন্সট্টুয়াল কাপের বাস্তব কিছু গবেষণা—
মেন্সট্টুয়াল কাপ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সতীত্ব নষ্টকারী, নিরাপত্তাহীন আর ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর তার একটা জরিপ দেখা যাক। অস্ট্রেলিয়ায় ১৫-২৪ বছর বয়সী ৫৩০ জন নারীদের উপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে :
(১) মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবহারের জরিপে অংশগ্রহণকারী নারী ৫৫% (৫৩০ জন)। তাদের মধ্যে মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার বাদ দিয়েছিল ১৬% নারী। ২৯% মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ব্যবহারের প্রথম চক্রে ৫৪% নারী মেন্সট্টুয়াল কাপ লিক (ফেটে যাওয়া/ছিদ্র) হওয়ার কথা জানিয়েছে। এবং ২৫% কাপটি লাগানো অবস্থায় ব্যথা ও অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৫% কাপটি খুলতে না পারার কথা জানায় এবং কাপটি খোলার জন্য অন্যজনের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। খোলার সময় স্থানচ্যুতর (অন্য স্থানে সরে যাওয়ার) ঘটনাও ঘটেছে। [১]
(২) অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ১০.৪% (৫৫ জন) প্রথম চেষ্টাতেই সফলভাবে মেনস্ট্রুয়াল কাপ প্রবেশ করাতে পেরেছিল। ২৬৫ জন বা ৫০.১% নারী দুই থেকে তিনবার চেষ্টার পর এটি প্রবেশ করাতে পেরেছিলেন। ৩০.১% (১৬০ জন)- চার বা তার বেশিবার চেষ্টার প্রয়োজন হয়েছিল এবং ৯.৪% (৫০ জন) কখনোই সফলভাবে কাপটি প্রবেশ করাতে পারেননি।
এবং ব্যবহারের সময়, ৮৭% কাপটি ঢোকানো বা বের করার সময় ব্যথা এবং অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। প্রায় অর্ধেক (৪৫%) প্রথম চেষ্টায় কাপটি বের করতে না পারার কথা জানিয়েছেন এবং ১৭% বের করতে সাহায্যে নিয়েছে। [১]
প্রাপ্ত ফলাফলের ব্যাখ্যা—
(১) জরিপে ৫৫% নারী অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে ৫৪% নারী জানিয়েছে মেন্সট্টুয়াল কাপ লিক (ফেটে/ছিদ্র) হয়েছে। মানে এটা লিক হয়ে যাচ্ছে তাও প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জনের অভিযোগ। তাহলে মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবসায়ীরা কোন যুক্তিতে বলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়, নিরাপদ, আরামদায়ক? ধোঁকাবাজি, মিথ্যাচারের একটা সীমা থাকা উচিত নয় কি? [২]
তারপর দেখেন ২৫% কাপটি লাগানোর পর অস্বস্তি ও ব্যথার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ মেন্সট্টুয়াল কাপ জরায়ু পথে প্রবেশের পর ব্যথা করে। কিন্তু তারা তো বলছিল এটা নাকি আরামদায়ক? এই বুঝি আরামদায়কের অবস্থা?
৪৫% (২৩৯ জন) নারী জরায়ুর ভিতরের কাপটি প্রবেশ করানোর পর বের করতে পারে নাই। এবং নির্দিষ্ট স্থানে না থেকে সরে যায়। সরে গেলে ব্যথা হবে, জ্বালাপোড়া হবে, ক্ষত, ইনফেকশন হবে। তাছাড়া জরায়ু মুখে দুর্ঘটনা ঘটারও সম্ভাবনা রয়েছে। এতো কিছুর পরও তারা কিসের ভিত্তিতে নারীদের বোকা বানাচ্ছে নিরাপদ বলে?
(২) ৫৩০ জন নারীর মধ্যে মাত্র ৫৫ জন নারী মেন্সট্টুয়াল কাপ পড়তে পারছে। ২৬৫ জন ২-৩ বার চেষ্টা পর পড়তে পারছে, ১৬০ জন ৪ বারেরও বেশি বার চেষ্টা পর মেন্সট্টুয়াল কাপ পড়তে পারছে।
মেন্সট্টুয়াল কাপ নাকি নিরাপদ, নারীরা সহজে পড়তে পারে তাহলে এতো বেশিসংখ্যক নারীর সমস্যা হলো কেন?
মূল কারণটা হচ্ছে জরায়ু পথ বা নালীর শুরুতে থাকে হাইমেন বা সতীত্ব পর্দা। এই পর্দায় কয়েকটা ছিদ্র থাকে পিরিয়ডের রক্ত বের হওয়ার জন্য। এই ছিদ্র দিয়ে ২.৫-৩± ইঞ্চি মেন্সট্টুয়াল কাপ প্রবেশ করাতে না পারাটাই স্বাভাবিক। একমাত্র সতীত্ব পর্দা সহবাস বা কোনোকিছুর ধাক্কা লাগার মাধ্যমে ছিঁড়তে পারে। এছাড়া ছিঁড়ার সম্ভাবনা কম। কিছু নারী অবশ্যই বলে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা তাদের সতীত্ব ছিঁড়েছে। (Clown Emoji).
তাছাড়া নারীর সতীত্ব পর্দা এবং জরায়ু পথ সংকুচিত অবস্থায় থাকে শুধুমাত্র যৌন উত্তেজনা/সহবাসের মাধ্যমে তা প্রসারিত হয়। সংকুচিত পথে যখন মোটা মেন্সট্টুয়াল কাপ জোর করে প্রবেশ করানো হয় তখন সর্বপ্রথম সতীত্ব পর্দা ছিঁড়ে যায়, ব্যথা করে, রক্তপাতও হতে পারে।
সতীত্ব পর্দা হচ্ছে দরজার মতো। যেটা সহবাস ব্যতীত সবসময় বন্ধ থাকে যেন বাইরের ক্ষতিকর কোনোকিছু প্রবেশ করে জরায়ু, জরায়ু নালী, জরায়ু মুখে সংক্রমণ ঘটাতে না পারে।
সংকুচিত জরায়ু পথ সবসময় ভিজে থাকে এবং কিছু প্রতিরোধী থাকে যারা সংক্রমণ, ইনফেকশন থেকে বাঁচায়। তো হালকা ভিজে থাকা জরায়ু পথে মেন্সট্টুয়াল কাপ জোর করে সংকুচিত পথে বের করা বা প্রবেশ কারার কারণে জরায়ু নালীতে ব্যথা হবে, ক্ষত হবে, ইনফেকশন হবে এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু তারা কেন এই সমস্যাগুলো এড়িয়ে যায়? বোনেরা কী কিছু বুঝতে পারছেন? যেহেতু মেন্সট্টুয়াল কাপ সিলিকন এবং বিশেষ ধরণের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। তাই এই কাপ যখন প্রবেশ করাবেন, বের করবেন তখন ঘর্ষণের ফলে ন্যানোপ্লাস্টিক কণা জরায়ু পথে রয়ে যাবে। পরে জরায়ু মুখে জমে ক্যান্সারও হতে পারে।
মেন্সট্রুয়াল কাপের অসুবিধা-ক্ষতিকর দিক—
মেন্সট্টুয়াল কাপ সংকুচিত পথে ঢুকানোর ফলে কি হবে উপরে বলেছি। তাছাড়া শুধু যে মেন্সট্টুয়াল কাপ ঢুকালে হবে তা কিন্তু নয় বরং জরায়ু মুখের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা বলা হচ্ছে (ছবি)।
এতো ভিতরে ঢুকানো হবে যে, কাপে রক্ত জমে থাকবে যখন নারী শুয়ে থাকবে তখন উল্টো জরায়ু মুখ দিয়ে জরায়ুতে রক্ত ঢুকে যাবে। হাঁটাচলা করবে তখন ছিটকে পরবে জরায়ু মুখসহ চারপাশে।
রক্ত তো নাপাক জিনিস তাছাড়া পিরিয়ডের রক্তে অনেক ক্ষতিকর উপাদান থাকে যা জরায়ু থেকে বের হয়ে যাওয়াই স্বাস্থ্যকর। কিন্তু কাপের মাধ্যমে যখন এটা আটকে রাখা হবে তখন সংক্রমণ হবে কিনা? শুধু সংক্রমণ না আপনারা জরায়ু নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ক্যান্সারেও আক্রান্ত হতে পারেন। প্রাকৃতিক নিয়মে রক্ত বের হতে দেওয়াই উত্তম নয় কী বোন?
শরিয়তের দৃষ্টিতে মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবহার জায়েজ কিনা?
শরিয়তের দৃষ্টিতে মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবহার জায়েজ নাকি না জায়েজ তা বলবে অভিজ্ঞ আলেম-মুফতিরা।
তবে আমার স্বল্প জ্ঞানের ভিত্তিতে কিছু বলতে হচ্ছে,
রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদামের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহ্বার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে। (মুসলিম- ২৬৫৭, আহমাদ- ৮২২২)
মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান হচ্ছে গোপন অঙ্গ বা যৌনাঙ্গ। সেখান স্পর্শ বা ঘর্ষণের মাধ্যমে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
সংকুচিত জরায়ুতে যখন মেন্সট্টুয়াল কাপ প্রবেশ/বের করা হবে আঙ্গুল বা অন্য কিছু (চেতনা দন্ডের মতো কি যেন বিক্রি করে, [২]) দিয়ে তখন সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। আর সেখান থেকে যিনার মতো কাজ করে ফেলাটা অসম্ভব কিছু না।
লোকমুখে শুনতাম ছেলেরা নাকি হেন্ডেল মারে, এখন দেখবেন মেয়েরাও শুরু করে দিবে। শুধু যে নারীদের সতীত্ব নষ্ট করছে তা নয় বরং যিনার চুড়ান্ত পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন বোনেরাও সিদ্ধান্ত নিবেন— জরায়ু, নিজেকে, আগামীর প্রজন্মকে বাঁচাবেন নাকি যিনা আর ক্ষতির পথ বেছে নিবেন।
পিরিয়ডে মেন্সট্টুয়াল কাপের বিকল্প সমাধান কী?
মেন্সট্টুয়াল কাপ ব্যবহার করতে নিষেধ করছি কেন আশা করি এই আলোচনায় বুঝতে পারছেন।
এখন বিকল্প হতে পারে সুতি কাপড় বা সুতি কাপড়ের প্যাড। যা প্রাকৃতিক, আরামদায়ক এবং নিরাপদ। হাঁটাচলা, ঘুমানো কিংবা কাজের মধ্যেও কোনো ধরনের অস্বস্তি বা ব্যথা হবে না সুতি কাপড় ব্যবহারে। সুতি কাপড় রক্ত শুষে নিবে, খোলামেলা হওয়ায় বাতাস রক্ত শুকিয়ে ফেলবে, সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে না। অন্যদিকে মেন্সট্টুয়াল কাপে তরল অবস্থায় থাকবে ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে।
অনেকে আবার বলতে পারেন স্যানিটারি ন্যাপকিন প্যাড থাকতে সুতি কাপড় কেন? স্যানিটারি ন্যাপকিন প্যাডে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানগুলো রক্তের মাধ্যমে জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছে ক্ষতিসাধন করতে পারে। তাই ন্যাপকিন প্যাড ব্যবহার না করার চেষ্টা করাই ভালো।
ন্যাপকিন প্যাড কিনতে যে টাকা খরচ করতে হবে তা দিয়ে কয়েক জোড়া সুতি কাপড় কিনে বছরের পর বছর ব্যবহার করতে পারবেন। সবচেয়ে ভালো হয় দাদী/নানী বেঁচে থাকলে তাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া তারা পিরিয়ডের সময় কীভাবে সুতি কাপড় ব্যবহার করতো। অথবা খোঁজ নিন বড় ফার্মেসিগুলোতে সুতি কাপড়ের প্যাড বিক্রি হয় কিনা।
তাছাড়া দাদী/নানীরা সুতি কাপড় ব্যবহার করতো নিরাপদ থাকতো না। ১০/১৫ টা বাচ্চা নিতে পারতো। আর এখনকার মেয়েরা ১টা নিয়েই আরেকটার বেলায় সিজারের কাজ লাগায়। শুধু শুধু খাদ্য ভেজালের দোষ দিবেন না। আরো অনেককিছুই এর জন্য দায়ী।
একাধিক সুতি কাপড় রাখলে ২ ঘন্টা পর পর পাল্টালে যথেষ্ট। দৈনিক লজ্জাস্থান ১/২ বার কুসুম গরম পানি দিয়ে নিলেই যথেষ্ট, সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা নেই। সুতি কাপড় ধুয়ে ধুয়ে ব্যবহার করতে পারবেন কমপক্ষে ১ বছরের মতো যাবে। যা আপনার আর্থিক দিক দিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, স্বাস্থ্যগত দিকও ঠিক থাকবে।
বোনেরা দাদী/নানীদের অনুসরণ করতে শিখুন। সুতি কাপড় ব্যবহার করুন, নিরাপদ থাকুন। আগামীর মুসলিম প্রজন্ম আপনার জরায়ুর সুস্থতার উপর নির্ভরশীল।
বোনেরা আশা করি বুঝতে পারছেন আমি কি বুঝাতে চেয়েছি। সব আধুনিকতায় আলো থাকে না অন্ধকারও থাকে। আগামীর প্রজন্ম আপনার হাতেই, রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই। যেটার প্রাকৃতিকভাবে সমাধান সম্ভব সেটা সমাধান করতে আধুনিকতার প্রয়োজন নেই। মানুষের শরীর প্রাকৃতিকটাই গ্ৰহণ করতে সক্ষম অপ্রাকৃতিকর নয়।
লিখেছেন : নাসিম আহমাদ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন